ইমরান খানের মতে আফগানিস্তান এত’দি’নে দা’স’ত্বে’র শৃ’ঙ্খ’ল ভে’ঙে’ছে!

 

ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শংকরের ছোটাছুটি

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর পশ্চিম এশিয়া চষে বেড়াচ্ছেন মূলত এসব শঙ্কা থেকেই। গত মাসে তিনি দু’বার দোহায় গেছেন। গত সপ্তাহে মস্কো যাওয়ার পথ তেহরানে নামেন তিনি।মজার ব্যাপার হলো, তিনি যখন ঐসব রাজধানীতে গেছেন তখন সেখানে তালেবানের নেতারা ছিলেন।

প্রশ্ন উঠেছে, এটা কি কাকতালীয়? নাকি পরিকল্পনার অংশ?

তালেবানের সাথে কোনও মীমাংসা নয়’- প্রকাশ্যে এই নীতি নিলেও ভারত সরকার হালে তালেবানের সাথে তলে তলে যোগাযোগ করার জোর চেষ্টা করছে, এমন কানাঘুষো দিনকে দিন বাড়ছে।

পাকিস্তানের সাংবাদিক সামি ইউসুফজাই, যার সাথে তালেবানের নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়, ২৯শে জুন এক টুইট করেন – “আফগান তালেবান সূত্র নিশ্চিত করেছে এস জয়শংকর এবং তালেবান নেতা মুল্লা বারাদার ও খায়রুল্লাহ শেখ দিলওয়ারের সাথে বৈঠক হয়েছে, যেখানে তালেবান নেতারা তাকে ভরসা দিয়েছেন যে ভারতের সাথে তাদের সম্পর্ক পাকিস্তানের ইচ্ছামত হবে না।“
গণতন্ত্রের হার হলো আফগানিস্তানে। তালিবানি শাসন প্রতিষ্ঠার পরপরই সমগ্র আফগানিস্তান জুড়ে চরম বিশৃংখল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। জঙ্গিদের কবলে চলে গেল সম্পূর্ণ আফগানিস্তান। সারা বিশ্ব যখন আফগানিস্তানের এই শোচনীয় পরিস্থিতি দেখে শিউরে উঠছে, চীন, ইরান, পাকিস্তান তখন আফগানিস্তানে তালিবানি শাসনকে স্বাগত জানিয়েছে। বিশেষত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের নতে আফগানিস্তান এতদিনে দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙেছে!
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে এক বিবৃতিতে বলেছে যে তালেবানের সাথে এরকম কোনও বৈঠক হয়নি, এসব খবর বানোয়াট।

তবে ড. ভরদোয়াজ বলেন যে তালেবানের সাথে বোঝাপড়ার উদ্যোগ নেওয়া ছাড়া ভারতের সামনে এখন তেমন কোন বিকল্প নেই।

“পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক কথা-বার্তা, বক্তৃতা থেকে আমি যা বুঝতে পারছি তাহলো, ভারত অনুধাবন করছে তালেবানকে অবজ্ঞা বা অস্বীকার করা সম্ভব নয়। তবে তালেবানের যা ইতিহাস-আদর্শ, তাতে তাদের সাথে কথা বলা হবে ভারতের জন্য বড় ধরণের বিড়ম্বনা।“

ভারত বিশ্বাস করে তালেবানের ক্ষমতাকালে ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি বিমান অপহরণ করে কান্দাহারে নিয়ে যাওয়ার ঘটনার সাথে পাকিস্তানের সেনা গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-য়ের সাথে তালেবানও সম্পৃক্ত ছিল।

আফগানিস্তানে বিদেশী সৈন্য প্রত্যাহার, ১৯৮৯ সালের প্রতিধ্বনি

এরপর ২০০৮ সালে কাবুলে ভারতীয় দূতাবাসে হামলা – যাতে ৫৮ জন নিহত হয় – তার পেছনেও তালেবানের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হাক্কানি নেটওয়ার্কের হাত ছিল বলে ভারত নিশ্চিত। ২০১৪ সালের ২৩শে মে হেরাতে ভারতীয় কনস্যুলেটে হামলার পেছনেও হাক্কানি নেটওয়ার্কের হাত ছিলে ভারত মনে করে।

এই যখন ইতিহাস তখন তালেবানের সাথে আপোষ-মীমাংসা নিয়ে ভারত কতটা ভরসা করতে পারে?

আফগানিস্তান থেকে আমেরিকান সৈন্য পুরোপুরি প্রত্যাহারের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই ঝড়ের গতিতে একের পর এক অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিচ্ছে তালেবান। দেশটির কমপক্ষে ৭০ শতাংশ এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে বলে দাবি করছে তালেবান, যা খুব শক্ত গলায় প্রত্যাখ্যান করতে পারছে না আফগান সরকার।
আফগানিস্তানে তালিবানি শাসন প্রতিষ্ঠায় সমর্থন জানাচ্ছে যে বিশ্ব নেতারা, তাদের মধ্যে চীন অন্যতম। চীন আশ্বস্ত করেছে, আফগানিস্তানে তালিবানি শাসন স্থায়ী হবে! ইরান জানিয়েছে, আফগানিস্থানে আমেরিকার হার স্থায়ী শান্তির আশা দেখাচ্ছো। ঠিক একই মুহূর্তে পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মন্তব্য, যখন আপনি অন্যের সংস্কৃতি আপন করে নেন, তখন আপনি মানসিকভাবে দাস হয়ে পড়েন। যা বাস্তবে দাস হওয়ার থেকেও শোচনীয়।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন, সাংস্কৃতিক দাসত্বের শিকল ছেড়ে বেরিয়ে আসা সহজ নয়। তবে আফগানিস্তান বর্তমানে সেই দাসত্বের শিকল ছেড়ে বেরিয়ে আসছে সমর্থ হয়েছে বলেই মন্তব্য ইমরান খানের। পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রী শাহ মেহমুদ কুরেশিও আশ্বস্ত করেছেন, আফগানিস্তানে রাজনৈতিক স্থিরতা কায়েম হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি তার বার্তা, এই সময় সকলেরই আফগানিস্তানের সঙ্গে সহাবস্থান বজায় রাখা উচিত!

তালিবান আগ্রাসনে জর্জরিত আফগানিস্তান! আফগান যোদ্ধা থেকে সাধারণ নাগরিক, দূর্বিসহ পরিস্থিতির শিকার সকলেই! বোমাবর্ষণ, রক্তাক্ত পরিবেশ সঙ্গে আতঙ্ক জীবনযাত্রার ভোল পাল্টে দিয়েছে কয়েক দিনেই। সম্ভবত, ১ আগস্টের মধ্যে মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেনের আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশের ফলস্বরূপ তালিবান বাড়বাড়ন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে আশঙ্কা।

তবে, আন্তর্জাতিক স্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভারতের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব কোনওভাবেই মেনে নিতে পারছেন না পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। মার্কিন প্রেসিডেন্টের উদ্দেশে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, আমেরিকার নজরে পাকিস্তান কেবলমাত্র আফগানিস্তানের দরকারে কাজে লাগতে পারে। ২০ বছর যুদ্ধের পর আফগানিস্তানে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে তা সমাধানের দায়িত্বই যেন পাকিস্তানের।
শুধু এখানেই থামেননি তিনি! কৌশলগত অংশীদারিত্বের সিদ্ধান্ত ভারতের সঙ্গে নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। ইসলামাবাদের বাড়িতে তিনি সাংবাদিকদের জানান, ভারতের সঙ্গে বৈঠকের পর থেকেই ওয়াশিংটন পাকিস্তানের সঙ্গে অন্যরকম আচরণ করছে। এমনকি এই বছরের প্রথম দিকেই বাডেন মার্কিন রাষ্ট্রপতির পদ অধিগ্রহণের পরেও কোনওরকম সৌজন্যমূলক বার্তালাপ তাঁর সঙ্গে হয়নি বলেই জানিয়েছেন পাক প্রধানমন্ত্রী।

সূত্র অনুযায়ী, আফগান-পাকিস্তান সীমান্তে তালিবান জঙ্গিদের নিরাপদ আস্তানা বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাকিস্তানি নেতৃত্বের সঙ্গে কথোপকথন এর ফলস্বরূপ আফগানিস্তানের ভিতরে আরও নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিতিশীলতার উৎস তৈরি করছে। উল্লেখ্য, এর আগে আফগানিস্তান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে পাক সরকারের প্রতি তালিবানদের প্রবেশের অনুমতি, তাদের নিরাপদ আশ্রয় এমনকি চিকিৎসা প্রদানের অভিযোগের উপর কটাক্ষ করা হয়েছিল।



পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মঈদ ইউসুফ সম্প্রতি আফগানিস্তানের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইসলামাবাদকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করার পরেও প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে আলোচনায় অনীহা প্রকাশ করায় যথেষ্ট হতাশ হয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এভাবেই যদি দেশের নেতৃত্বকে অবহেলা করতে থাকে তবে ইসলামাবাদের অন্য বিকল্প আছে বলে জানিয়ে দেন উপদেষ্টা।
হেরাত, জালালাবাদ এবং মাজার-ই-শরীফের ভারতীয় কনস্যুলেটগুলো এখনও বন্ধ করা না হলেও, সেগুলোতে কাজকর্ম কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে।

কয়েক ডজন কূটনীতিককে দিল্লিতে ফিরিয়ে আনার এই সিদ্ধান্তের কয়েকদিন আগে গত সপ্তাহেই আফগানিস্তানে ভারতের সাহায্যে নতুন করে তৈরি একটি ড্যাম বা বাঁধে তালেবানের হামলায় কমপক্ষে ১০ জন নিরাপত্তা রক্ষী মারা যায়।

হেরাত প্রদেশে ওই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি আফগানিস্তানে ভারতের সবচেয়ে বড় প্রকল্প, যেটিতে তারা ৩০ কোটি মার্কিন ডলার খরচ করেছে। নতুন করে তৈরির পর সালমা ড্যাম নামে পরিচিত ওই বাঁধের নামকরণ করা হয় ভারত-আফগানিস্তান মৈত্রী ড্যাম, যেটির উদ্বোধন করতে ২০১৬ সালের জুনে আফগানিস্তান গিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী

যদিও বা মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর অবশ্য ইসলামাবাদকে আশ্বস্ত করেছিল, ওয়াশিংটন আফগানিস্তানে শান্তি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা স্বীকার করে এবং তারা চায় ইসলামাবাদ সেই ভূমিকা পালন করুক। জানা গেছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব লয়েড অস্টিন এই সপ্তাহে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়ার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন এবং আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

আফগানিস্তান নিয়ে ভারত কেন সবচেয়ে বেশি চিন্তায়?

তালেবান আবারও আফগানিস্তান নিয়ন্ত্রণ করবে এই সম্ভাবনায় অন্য অনেক দেশই উদ্বিগ্ন, তবে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় পড়েছে সম্ভবত ভারত।

“অনেক দেশই আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন, কিন্তু অন্য যে কোনও দেশের চেয়ে আফগানিস্তানে সবচেয়ে বেশি স্বার্থ এখন ভারতের। তালেবান আবার ক্ষমতা নিলে ভারতের ক্ষতি হবে সবচেয়ে বেশি,“ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ড. সঞ্জয় ভরদোয়াজ, যিনি দিল্লির জওহারলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক।

“ভারতের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য আফগানিস্তানের গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে ভারত এখন জটিল এক সংকটে পড়েছে।“

কুড়ি বছর আগে ২০০১ সালে আমেরিকার সামরিক অভিযানে ক্ষমতা থেকে তালেবান উৎখাত হওয়ার পর যে দেশটি আফগানিস্তানে প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়াতে সবচেয়ে তৎপর হয়েছিল, সেটি ভারত।

*

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post

You Should Read More